অন্তত হাঁটায় উপেক্ষিত নন রাহুল

গত ২ অক্টোবর, এ বারের গান্ধী জয়ন্তীতে কয়েকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন দত্তাত্রেয় হোসাবোলে। তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে চর্চাওহয়েছে বিস্তর। হবে না-ই বা কেন? হোসাবোলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সাধারণ সম্পাদক। দু’নম্বর নেতা। এবংঅনেকের মতে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতের সম্ভাব্য উত্তরসূরি। এই ঘোর নরেন্দ্র মোদীর জমানায় এ হেন হোসাবোলের মুখে যদিবেকারত্ব, অসাম্যের মতো বিষয় উঠে আসে, তা সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়ার কথা, কেড়েওছে। এক জন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবেআমার প্রশ্ন হল, হঠাৎ তাঁর গলায় এমন সুর কেন? এর সঙ্গে কি কোনও ভাবে রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো’যাত্রার যোগ রয়েছে?
 

 

ঠিক কী বলেছেন হোসাবোলে? সঙ্ঘেরই শাখা স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের এক আলোচনাসভায় তিনি বলেছেন, এখনও দেশে ২০ কোটিমানুষের বাস দারিদ্রসীমার নীচে। ২৩ কোটি মানুষের দৈনিক গড় রোজগার ৩৭৫ টাকা। সব মিলিয়ে, ভারতবর্ষে দারিদ্র যেন এক অসুরেরমতো। তাকে ‘হত্যা’ করা জরুরি। রাষ্ট্রপুঞ্জের বিভিন্ন রিপোর্ট তুলে ধরে এই সঙ্ঘনেতা দেখিয়েছেন যে, দারিদ্র, গ্রামে পানীয় জলেরঅভাব ইত্যাদি এখনও কতটা প্রকট। এই সমস্ত সমস্যা মোকাবিলায় মোদী সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প ও উদ্যোগের প্রশংসা তাঁর মুখে শোনাগিয়েছে। কিন্তু তেমনই তিনি মেনেছেন যে, সামনের সমস্যা খুব বড়। এ দেশ থেকে দারিদ্র দূর করা সত্যিই মস্ত চ্যালেঞ্জ।
 

 

এখানেই শেষ নয়। আরও একটি খুবই জানা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা ওই দিন শোনা গিয়েছে সঙ্ঘের দু’নম্বর পদাধিকারীর মুখে। তিনিকোনও ধনকুবেরের নাম করেননি। কিন্তু বলেছেন যে, ধনী-দরিদ্রের অসাম্য এই দেশে বেড়েছে আশঙ্কাজনক ভাবে। আয়ের নিরিখেএকেবারে উপরের ১ শতাংশ মানুষের হাতে সারা দেশের মোট আয়ের ২০ শতাংশ। আর কম আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে সেখানেমোটে ১৩ শতাংশ। যুবক-যুবতীদের চাকরি নেই। বেকারত্ব জ্বলন্ত সমস্যা।

 

এই সমস্ত কথা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন কংগ্রেস-সহ বিরোধী নেতারা। প্রশ্ন তুলছেন মোদী সরকারের সাফল্য প্রচার নিয়ে। কিন্তুঅনেক দিন পরে দেখছি যে, আরএসএসের কোনও শীর্ষ নেতা এই সমস্ত বিষয়ে সরাসরি কিছু বলছেন কোনও সার্বজনিক মঞ্চে।

অনেকে বলতেই পারেন, এ কৌশল একেবারে নতুন কি? এর আগে মোদী সরকারের শ্রমনীতির বিরোধিতায় নেমেছিল সঙ্ঘেরই ভারতীয়মজদুর সঙ্ঘ (বিএমএস)। যেন সাধারণ মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ নিজেরাই বিরোধী হিসেবে কিছুটা বার করে দেওয়ার কৌশল।কিন্তু তা সত্ত্বেও যে এর সঙ্গে ‘ভারত জোড়ো’যাত্রার যোগ পাচ্ছি, তার কারণ একাধিক।

 

গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩৫০০ কিলোমিটার হাঁটা শুরু করেছেন রাহুল গান্ধী। সেই রাহুল, যাঁকে নিয়ে বিজেপি এবং কিছু ক্ষেত্রেআরএসএস-এর অনেকে প্রায়শই ঠাট্টা-ইয়ার্কি করেন। দাগিয়ে দেন ‘কিছুই করে উঠতে না পারা পাপ্পু’ হিসেবে। দেখে মনে হচ্ছে, এ বারবোধহয় তাঁরা একটু নড়ে বসতে বাধ্য হয়েছেন। রাহুলের এই পথ-পরিক্রমাকে অন্তত উপেক্ষা করতে পারছেন না একেবারে। যদি উপেক্ষাইকরতে পারতেন, তা হলে রাহুলকে নাগাড়ে আক্রমণ করে যেতে হত কি? তার জন্য আশ্রয় নিতে হত মিথ্যে কিংবা ভুয়ো খবরের? 

সম্প্রতি ‘দ্য ওয়ার’-এ একটি ভিডিয়ো তুলে দিয়েছেন সাহিল মুরলী মেঙ্ঘানি। তাতে এমন দশটি ভুয়ো, মিথ্যে খবর প্রচারের জলজ্যান্তপ্রমাণ রয়েছে।

 

উদাহরণ? কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুকল্যাণমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি এক বক্তৃতায় বলে বসলেন, কন্যাকুমারী থেকে যাত্রা শুরু করেছেন রাহুল।অথচ বিবেকানন্দের মূর্তিতে (স্বামী বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল) প্রণাম পর্যন্ত করেননি। অথচ পরে কংগ্রেসের তুলে ধরা ছবিতে দেখাগেল, রাহুল সেখানে প্রণাম করেছেন! 

বিজেপির আইটি সেলের বড় কর্তা অমিত মালবীয়ের দাবি ছিল, রাহুল এই যাত্রায় কোনও মন্দিরে যাননি। বক্তৃতা করেননি কোনওসার্বজনিক মঞ্চে। অথচ দু’টিই নির্জলা মিথ্যে।

 

বেশ কয়েকটি দক্ষিণপন্থী সোশ্যাল মিডিয়া এবং টিভি চ্যানেল দেখিয়েছে, যাত্রাপথে কন্টেনারে রাত কাটানোর ধারণা নাকি পাকিস্তানেরপ্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং বেনজির ভুট্টোর কাছ থেকে ধার করেছেন রাহুল। এই খবরও মিথ্যা।

 

সমাজ মাধ্যমে ছবি ভেসে উঠল কংগ্রেস নেতা শশী তারুর কথা বলছেন কয়েক জন মহিলার সঙ্গে। সঙ্গে প্রশ্ন, ‘এটাই কি যাত্রা?’ কখনওছবিতে দেখা গেল, রাহুল না হেঁটে মোটরসাইকেলে সওয়ার। পরে জানা গেল, দু’টিই বছর পাঁচেকের পুরনো ছবি। একই ভাবে‘ভাইরাল’ করা রাহুলের নিষিদ্ধ সংগঠন পিএফআই-কে সমর্থনের ছবিও দেখা গেল ভুয়ো।

সব থেকে নক্কারজনক হল, রাহুলের সঙ্গে একটি বাচ্চা মেয়ের খেলার ছবি ছড়িয়ে দেওয়া। সঙ্গে যাত্রার গুরুত্বকে খাটো করে রাহুলেরখেলাকেই বড় করে দেখানোর চেষ্টা। কিন্তু সত্যিটা হল, ওই শিশু আসলে প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর মেয়ে মিরয়া। এই ছবিও সাত বছর আগের, দিল্লিতে তোলা! এমন উদাহরণ অজস্র।

 

প্রশ্ন হল, বিজেপির দাবিই যদি সত্যি হয়, যদি রাহুলের যাত্রার কোনও প্রভাব ভারতীয় রাজনীতিতে না পড়ে, তা হলে কেন এত মিথ্যেপ্রচার?

এই যাত্রা কংগ্রেসকে আখেরে কতটা শক্তিশালী করবে, কতটা ভোট ফিরিয়ে আনবে ব্যালট-যন্ত্রে, তার উত্তর দেবে সময়। তবে আমারমতে, এতে অন্তত কংগ্রেসের লোকসান হবে না। তবে হ্যাঁ, বছর তিনেক আগে এই ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রা করতে পারলে, রাহুল এবংকংগ্রেসের হয়তো অনেক বেশি লাভ হত।

Featured Book: As Author
An Unflattering Story About Ola's Bhavish Aggarwal
Behind the Incredible Rise and Impending Fall of an Indian Unicorn
  • Authorship: Sourya Majumder, Paranjoy Guha Thakurta
  • Publisher: Paranjoy
  • 148 pages
  • Published month:
  • Buy from Amazon
 
Documentary: Featured
Featured Book: As Publisher
Corruption, CBI and I
More than Memoirs of a Veteran Scam-Buster
  • Authorship: Shantonu Sen with Sanjukta Basu
  • Publisher: Paranjoy Guha Thakurta
  • 260 pages
  • Published month:
  • Buy from Amazon